05/08/2025
ইতিহাস বইয়ের পাতায় রয়েছে আমাদের উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের গল্প।
ষোড়শ শতকের শেষ ভাগ। বিশ্বজুড়ে চলেছে spice race কারণ মশলা সেসময় বেজায় মূল্যবান। আর তাই নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে চলেছে প্রতিযোগিতা-- কে আগে ইস্ট অর্থাৎ পূর্বের দেশগুলিতে, বিশেষ করে ভারত , মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া পৌঁছতে পারে । আর এই প্রতিযোগিতায় ইংল্যান্ড কিছুটা পিছিয়ে পড়ছিল। ১৬০০ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর রানী এলিজাবেথ "the governor and company of merchants of London trading into the east Indies" তৈরিতে অনুমোদন দিলেন। পরবর্তীতে এর নাম হয় East India company। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাকে ১৫ বছরের জন্য একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার দেওয়া হলো ।
সময় যত এগিয়েছে সেই কোম্পানি ততই ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ১৬০৮ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি প্রাপ্তি থেকে শুরু করে একটু একটু করে ভারতের মাটিতে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে তারা।
শুধুই কি প্রভাব?
রীতিমতো নিজেদের আলাদা পরিচয় গড়ে তোলে। যারা ভারতীয় মসলা, সিল্ক, কাপড়ের মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যের জন্য এদেশে এসেছিল , তাদেরই সেনাবাহিনী ১৭৫৭-তে পলাশীর যুদ্ধ, ১৭৬৪ তে বক্সার যুদ্ধ, মহীশূর যুদ্ধ, মারাঠা যুদ্ধ করে ভারতবর্ষকে তো বটেই পুরো উপমহাদেশকে ব্রিটিশদের কব্জায় নিয়ে আসে। দেশের অর্থনীতির স্বনির্ভর সত্তাকে কৌশলে পরনির্ভর করে তুলেছিল এই কোম্পানি।
কোম্পানির এই দাপট সহ্য হলো না ব্রিটিশ সরকারের। ১৮৫৭-তে সিপাহী বিদ্রোহের জেরে কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা কেড়ে নেয় তারা। অবশ্য , কোম্পানির অন্যায় শুধু সিপাহী বিদ্রোহে থেমে ছিল না। তার দুর্নীতি ও শোষণ নিয়েও ব্রিটিশ সংসদে বহু বিতর্ক হয় — জনমতও তাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। ১৮৫৮ তে Government of India act পাস করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিদায় সুনিশ্চিত করে। ভারতের শাসনভার তুলে দেওয়া হয় লর্ড ক্যানিংয়ের হাতে। ১৮৭৪ সালে পয়লা জানুয়ারি ওই কোম্পানিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে লন্ডন গেজেটে লেখা হয় "The East India company is here by dissolved". এক ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ বলেছিলেন, "a company should not be allowed to become a nation."
তবে অকৃতজ্ঞ নই। তাই ভুলবো না, এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় কালেই দেশের রেল নেটওয়ার্কের প্রথম লাইন নির্মাণ শুরু হয় ১৮৫০ সালে। শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকটাই প্রসার ঘটে। সতীদাহের মতো ভয়ংকর প্রথা বিলুপ্তির জন্য সংস্কার মূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
তবু এই কোম্পানিকে থেমে যেতে হল। কারণ ঐ.....
কোন কিছুই যে অতিরিক্ত ভালো নয় । তা সেটা সেকাল হোক বা একাল।
১৮৭৪ থেকে ২০০৫--এই সময়কাল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অস্তিত্ব ছিল sleeping empire -এর মতো। তার নাম, লোগো, ট্রেডমার্ক, শিলমোহর সবকিছুই পাবলিক ডোমেনে চলে আসে। আর এরপর?
এরপর কোম্পানির ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল একজন ভারতীয়ের হাত ধরেই।
প্রবাসী ওই উদ্যোক্তা বলেছিলেন, “আমি শুধু একটা কোম্পানি কিনিনি। আমি এক ঐতিহাসিক প্রতীককে পুনরুদ্ধার করেছি। আজ আমি সেই নামকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে তাকে excellence-এর প্রতীক বানাতে চাই।”
২০০৫ সালে সেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পুনরুদ্ধার করে ব্যবসায়িক ব্র্যান্ড করে তোলেন। ৮টি আলাদা উৎস থেকে কোম্পানির নাম, ট্রেডমার্ক, seal একে একে কিনে নেন তিনি। পুরো acquisition সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছিল প্রায় এক দশক। ২০১০ সালে তিনি নতুন কোম্পানি লঞ্চ করলেন। এখন সেই কোম্পানি এক বিলাসবহুল খাদ্য ও হোমওয়্যার ব্র্যান্ড। Heritage lifestyle brand গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন সঞ্জীব মেহেতা । যা একদিন দম্ভের প্রতীক ছিল, আজ তা ঐতিহ্যের প্রতীক হতে চলেছে। কলোনিয়াল পাওয়ার থেকে সে এখন luxury goods-এর কোম্পানি। চা, কফি, চকলেট, জ্যাম, বিস্কুট, চাটনি , home and fashion, accessories......
সময় কিভাবে কথা বলে!!
কখনো ভাবা গেছিল যে "ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি"--এই নাম আমাদেরও হতে পারে?
ইতিহাসের বোঝা নয় , ঐতিহ্যের শক্তি হিসেবে এই কোম্পানিকে গড়তে চান সঞ্জীব মেহতা। তিনি বলেন, I wanted to transform a symbol of oppression into a symbol of excellence and luxury -- a legacy reclaimed with pride.
একজন ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা হিসেবে সঞ্জীব মেহতার একটি কোম্পানি কিনে নেওয়া, হয়তো তেমন কিছু নয়। কিন্তু প্রসঙ্গটা যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, প্রশ্নটা যখন যখন ২০০ বছরের ব্রিটিশ পরাধীনতার জ্বালা , উত্তরটা তখন হয়তো এমনটাই হয় যে সঞ্জীব মেহতার এই মালিকানা ভারতীয় হিসেবে আমাদেরকে অহংকারী করলো।
জয় হিন্দ।