23/03/2026
আমাদের কোন্ডার ইতিহাস জানতে হলে আগে জানতে হবে এ অঞ্চলে প্রবাহিত নদীর ইতিহাস। কারণ নদীর কোল ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলের সভ্যতা।
কেরানীগঞ্জের ইতিহাসের সাথে জরিয়ে আছে দুটি নদী একটি বুড়িগঙ্গা আরেকটি ধলেশ্বরী নদী। ধলেশ্বরী নদীই মুলত বেষ্টিত করে রেখেছে পুরো কেরানীগঞ্জ কে।
ধলেশ্বরী নদী থেকে শাখা বের হয়ে আরেকটি নদী কেরানীগঞ্জের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কেরানীগঞ্জের জাজিরায় আবারও ধলেশ্বরীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। গ্রামের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা চলত সেই নদী। সেই নদীর নামটি হল সিংহ নদী। উল্লেখ সেই সিংহ নদীই আমাদের চরাঞ্চলে সিং ধরিয়ার নদী নামে ঐ সময়ে পরিচিত ছিল। এখনো বয়স্ক মুরুব্বিদের কাছে অনেকে শুনে থাকবেন।
এক সময় লোকজন এ নদী দিয়ে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীতে যাতায়াত করত। তাছাড়া ব্যবসায়ীরা বিক্রমপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, খুলনার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এ নদীটি ব্যবহার করত। একসময় এ খরস্রোতা সিংহ নদী দিয়ে শত শত মণের ধান-পাট বোঝাই নৌকা পাল তুলে যাতায়াত করত। সিংহের মতো এ নদীর স্রোতের আওয়াজ ছিল। এ জন্য লোকেরা সিংহ নদী বলে আখ্যায়িত করেছে।
কেরানীগঞ্জের বুক চিরে বয়ে চলা সিংহ নদীকে ঘিরেই চলতো এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা। মাছ ধরা থেকে শুরু করে জমিতে সেচ ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত এ নদীর পানি। কিন্তু এসব এখন ইতিহাস।
সেই সিংহ নদীর শাখা-উপশাখা প্রবাহিত হত আমাদের কোন্ডার উপর দিয়ে। সিংহ নদীর একটি শাখা চলে গিয়েছে মোল্লা বাজারের পাশ দিয়ে পাইনারচর হয়ে চান্দের চরের দিকে। আরেকটি শাখার উপশাখা হয়ে আমাদের কোন্ডার ছোট ছোট গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে চলত।
এই নদীটা এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিশে ছিল।
সিংহ নদীর কিছু উপশাখার বর্তমান অবস্থান নিম্নরূপ।
১। মোল্লা বাজার হতে একটি উপশাখা নতুন বাক্তার চরের ভিতর দিয়ে গুচ্ছ গ্রাম পর্যন্ত (নতুন বাক্তার চর স্কুল এন্ড কলেজের সামনের যায়গা) বয়ে চলত।
২। মোল্লা বাজার হতে আরেকটি উপশাখা বাক্তার চর বড় পুসকুনি হয়ে ঈদগা মাঠে। এবং বাক্তার চর উকিল বাড়ি পুসকুনিতে গিয়ে পৌঁছাত।
৩। মোল্লা বাজার হতে গেদার বারির জোল (আঞ্চলিক নাম) দিয়ে গোগের পাড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো।
৪। আরেকটি ঢোকেছে জাজিরার বর্তমান ব্রিক ফিল্ডের মধ্য দিয়ে জাজিরা-বিবির বাজার ব্রিজের নিচ দিয়ে বিবির বাজারের খাল হয়ে কোন্ডার চরের পাশ দিয়ে নয়ামাটির পিছন দিয়ে গয়েশ্বর বাড়ির ব্রিজে দিকে...
জনশ্রুতি আছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা থেকে অনেক পরিবার তখন নৌকা করে এই সিংহ নদীর পথেই পালিয়েছিল। এই নদীর কারনেই স্টিমার নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের গ্রামগুলতে ঢোকতে পারেনি। মূল নদী দিয়ে মুন্সিগঞ্জের দিকে যেত তারা।
আমাদের এলাকার অনেকেই তখন এই নদিতে খেয়া চালাত, ইটের নৌকায় কাজ করত, মাছ ধরত ইত্যাদি।
অনেকের কাছে শুনে থাকবেন বর্ষার মৌসুমে এই নদী দিয়েই নৌকায় করে এলাকার অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও পাড়াগ্রাম (পাড়াগাঁও) হাঁট থেকে গবাদি পশু, ফুলমুল, আনাজপাতি নিয়ে আসত। শনি ও বুধবার হাট বসত। হাটুরেরাও নৌকাতেই যাতায়াত করত।
দুইশ-তিনশ মণ ধান নিয়ে নৌকাগুলো সিংহ নদী হয়ে সোয়ারীঘাট যেত। বর্ষায় স্রোতের এমন টান থাকত যে দুই মাল্লা, এক মাঝি মিলেও নৌকা তীরে ভেড়াতে পারত না।
পরের দিকে শুকনো মৌসুমে নৌকা চলত না। তখন এখানকার লোকজন হেঁটে জিনজিরা যেত। তারপরে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে ঢাকা।
সিংহ নদী শুধু একটি নদী ছিল না—
এটি ছিল এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, ইতিহাস ও অর্থনীতির প্রাণ।
নদী হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার গল্প এখনো বেঁচে আছে মানুষের স্মৃতিতে।
💬 আপনারা কি “সিং ধরিয়ার নদী” নামটা শুনেছেন আগে? কমেন্টে জানান👇
#বাংলার_ঐতিহ্য #আমার_গ্রাম #আমার_ইতিহাস