30/03/2026
হাম নিয়ে ১০টা জরুরি কথা
বর্তমানে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত মার্চ মাসেই অন্তত ২১ জন শিশুর মৃত্যু সংবাদ আমাদের ব্যথিত করেছে। বিশেষ করে রাজশাহী আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একটি ছোট অবহেলা কীভাবে মহামারীর রূপ নিতে পারে। আমাদের অবহেলার মাসুল যেন আর কোনো শিশুকে প্রাণ দিয়ে দিতে না হয়।
১। হাম অত্যন্ত মারাত্মক একটি সংক্রামক রোগ। একজন হামের রোগী থেকে গড়ে ১২-১৮ জন সুস্থ মানুষের সংক্রমণ হতে পারে। বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে ভালো ভ্যাকসিন কাভারেজ থাকায় এটি হয়তো কোভিডের মতো হবে না, কিন্তু সংক্রমণের ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি। হাম মূলত বাতাসের মাধ্যমেই ছড়ায় তাই দ্রুত গতীতে ছড়ায়।
২। হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সমাজের অন্তত ৯৩% এর বেশি মানুষকে টিকার আওতায় থাকতে হয়। গত এক দশকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে "anti-vaxxer" বা টিকাবিরোধী প্রচারণা বাড়ায় সেখানে টিকার হার ৭৫-৮৫% এ নেমে এসেছে, যার ফলে সেখানে কয়েক মাস পরপর হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। এমনকি যারা দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন, তাদের মধ্যেও ৩% মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পুরো জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখতে সবার টিকা নেওয়া জরুরি। তাহলে হাম ছড়ানোর জায়গা না পেয়ে এই ৩% ও সুরক্ষিত থাকবে "herd immunity" দিয়ে।
৩। হামের শুরুটা অন্য যেকোনো সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই হয়। উচ্চ তাপমাত্রার জ্বরের সাথে কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হয়ে জল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। জ্বরের দুই-তিন দিন পর গালের ভেতরের দিকে ছোট ছোট সাদাটে দাগ (Koplik spots) দেখা দিতে পারে। তারপর পুরা গায়ে লাল rash দেখা দেয়৷
৪। কিন্তু মৃত্যু ঘটে স্পেসিফিক কিছু কারনে। ভয়াবহ রূপ নিলে নিউমোনিয়া (Pneumonia) এবং এনকেফালাইটিস (Encephalitis) বা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি করে, যা শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সব হামের রোগীর এগুলা হয়না। অধিকাংশই এমনিতেই ভাল হয়ে যায়।
৫। কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন? যদি দেখেন শিশুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বা শ্বাস খুব দ্রুত চলছে, শিশু নিস্তেজ হয়ে পড়ছে, ঘাড় শক্ত হয়ে যাচ্ছে, খিচুঁনি হচ্ছে তবে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিন।
৬। সরকারের করনিয় কি? এখনই হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন বেডের সংখ্যা বাড়ানো। অন্যান্য রোগী যদি হাসপাতাল থেকেই হাম রোগে আক্রান্ত হয় ব্যাপারটা একেবারেই প্যাথেটিক। যেহেতু এটি বায়ুবাহিত, তাই সাধারণ রোগীদের থেকে হামের রোগীদের আলাদা রাখা জরুরি। পাশাপাশি জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউ (ICU) সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে। জটিল রোগীদের বেশ কয়েকদিন আইসিইউ সাপোর্ট লাগে।
৭। জনস্বার্থে সরকারকে দ্রুত 'ক্যাচ-আপ' ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্পেইন শুরু করতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি সেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা দ্রুত কাজ করতে হবে। ভ্যাক্সিন শর্টেজ থাকলে এটা জরুরি ভিত্তিতে সোর্স করাটাও জরুরি।
৮। বাংলাদেশে সম্প্রতি টিকার হার কমে যাওয়ার কথা বলে হচ্ছে৷ এটার অন্যতম কারণ লজিস্টিক গ্যাপ যা ভাইরাসের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এটার দায় গত সরকারের হলেও এটাকে কারেকশান করার কাজ এখনের সরকারের৷ আবল তাবল কথাবার্তা না বলে দ্রুত কাজে নামা জরুরি।
৯। উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে অনেক শিশুর বয়স ৯ মাসের কম, অর্থাৎ তাদের প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে। এর মানে হলো সমাজে ভাইরাসের উপস্থিতি এতটাই বেশি যে ছোট শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না।
১০। তবে আশার কথা হলো, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নিলে এবং সচেতনতা বাড়ালে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব সাধারণত স্বল্পস্থায়ী হয়। আমরা যদি সবাই মিলে শিশুদের টিকা নিশ্চিত করি এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, তবে দ্রুতই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সচেতন হোন, আপনার শিশুকে টিকা দিন।
ডা. রাঈয়্যিক রিদওয়ান
পেডিয়াট্রিক ইমার্জেন্সি মেডিসিন রেজিস্ট্রার
ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি হসপিটালস এনএইচএস ফাউন্ডেশান ট্রাস্ট